বাঙলা সাহিত্যের চৈতন্য যুগ (খ্রীঃ ১৫০০-খ্রীঃ ১৭০০)

বাঙলা সাহিত্যের চৈতন্য যুগ (খ্রীঃ ১৫০০-খ্রীঃ ১৭০০)


শ্রী শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব-কালে বাঙালী সমাজের অবস্থা...যদিও বৈষ্ণব প্রেরণা ছিল প্রতিরোধের প্রেরণা, সে প্রতিরোধ রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক।

শ্রীচৈতন্য ১৪৮৬ খ্রীস্টাব্দে (১৪০৭ শকাব্দে) নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন, ১৫৩৩ খ্রীস্টাব্দে (১৪৫৫ শকাব্দে) পুরীতে তাঁর দেহাবসান হয়। তাঁর পিতা ছিলেন নবদ্বীপ-প্রবাসী শ্রীহট্টের পণ্ডিত জগন্নাথ মিশ্র, মাতা শচীদেবী। তাঁর এক অগ্রজ বিশ্বরূপ অল্প বয়সেই গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন।শ্রীচৈতন্যের নাম ছিল বিশ্বম্ভর, ডাকনাম ছিল নিমাই। তাঁর গায়ের রঙ ছিল গৌরবর্ণ, তাই তাঁর নাম গৌরাঙ্গ (গোরা)। অসাধারণ মেধাবী নিমাই কিন্তু বাল্যে ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চলপ্রকৃতি-বিশিষ্ট; নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ও টোলের পড়ুয়াদের ক্ষ্যাপাতে, জ্বালাতন করতে ওস্তাদ। সেদিনের নবদ্বীপ ছিল নব্য ন্যায়ের পীঠস্থান। এই দুষ্টু ছেলেই যৌবনে সেখানকার সর্বাগ্রগণ্য পণ্ডিত হয়ে উঠলেন। অধ্যাপক রূপে টোলও তিনি খুললেন। নবদ্বীপে তখন বৈষ্ণবধর্মেরও জাগরণ আরম্ভ হয়েছিল, তার ইতিহাস আছে; আর তা চৈতন্যদেবের সহচরদের দেখেও বোঝা যায়। নিমাই পণ্ডিতের জীবনেও ধর্মের ও আধ্যাত্মিকতার ঢেউ নিশ্চয়ই আগেই লেগেছিল; কিন্তু পিতৃকৃত্য করতে গয়া গিয়ে তিনি যখন ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করলেন, তারপর থেকেই তাঁর জীবনে এক নূতন পর্বের সূচনা হল। 

ভগবৎপ্রেমে পাগল হয়ে বিশ্বস্তর তখন নবদ্বীপে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, হরিসংকীর্তন প্রভৃতি নিয়ে মেতে উঠলেন। তাঁর ভাবের বন্যায় নবদ্বীপ তখন টলমল করতে লাগল। তাঁর প্রধান সঙ্গী তখন নিত্যানন্দ ও যবন হরিদাস কিন্তু তখনো চৈতন্যদেবের ভক্তি-জীবনের মাত্র প্রথম পর্ব। তিনি তখনো সন্ন্যাস গ্রহণ করেন নি। এর পরে ২৪ বৎসর বয়সে কাটোয়ায় কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করে নিমাই হলেন 'শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্য', সাধারণ কথায় 'শ্রীচৈতন্য'। তাঁর নবদ্বীপ-লীলার সহচরেরা তাঁকেই আরাধ্য এবং অবতার রূপে সাধনার লক্ষ্য বলে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তাঁরা অনেকেই চৈতন্যের পরবর্তী জীবনলীলা, তাঁর রাধাভাবের সাধনা, কৃষ্ণপ্রেমের উজ্জ্বল উদ্ভাস স্বচক্ষে দেখেননি, সেই লীলার বিশেষ উল্লেখও করেন নি। তাঁদের নিকট গৌরলীলাই প্রধান কথা।

সন্ন্যাস গ্রহণু করে চৈতন্যদেব পুরীতে যান। বলতে গেলে তখন থেকে পুরীতে নীলাচলই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান আসন। অবশ্য প্রথম দিকে তা ছেড়ে অন্তত তিন-চারবার তীর্থ পর্যটনেও তিনি বেরিয়েছিলেন, তাতে ছ বছর কেটে যায়। প্রথমবার তিনি দাক্ষিণাত্য, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট ভ্রমণ করেন।দ্বিতীয়বারে তাঁর লক্ষ্য ছিল বৃন্দাবন। কিন্তু শান্তিপুর, গৌড় ও রামকেলি হয়ে তিনি ফিরে আসেন। এই রামকেলিতেই তখন তাঁর সংস্পর্শে আসেন সুলতান হুসেন শাহের মন্ত্রী 'দবীর খাস্' সনাতন ও 'সাকর মল্লিক' রূপ। এই দুই ভাই বৈষ্ণব ইতিহাসের দুই অপরাজেয় ভক্ত পণ্ডিত, বৃন্দাবনের গোস্বামীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় দুই গোস্বামী। শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁরাও সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এরপরে শ্রীচৈতন্য যখন তীর্থযাত্রা করলেন তখন ঝাড়খণ্ড (ছোটনাগপুর) হয়ে অরণ্যময় পথে গেলেন। কাশী, মথুরা প্রভৃতি বড় বড় তীর্থ তাঁর পথে পড়ল; সাধু, সন্ন্যাসী, পণ্ডিত, দার্শনিক সকলের সঙ্গে পথে পথে তাঁর প্রেমধর্ম নিয়ে বহু বিচার হল। প্রয়াগে তাঁর সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ হয় রূপের; আর প্রত্যাবর্তনের পথে কাশীতে সনাতন তাঁর সঙ্গে মিলিত হন।

এই তীর্থপর্যটনের ফলে ভারতবর্ষের বিরাট জীবনের সঙ্গে শুধু শ্রীচৈতন্যদেবেরই যে পরিচয় ঘটল, তা নয়। তাঁর জীবন ও প্রেমধর্ম যখন সমস্ত সমসাময়িক বাঙালী জীবনকে প্রেরণা দান করল তখন সাধারণ ভাবে সেই বাঙালীও ভারতের প্রাণকেন্দ্রের সঙ্গে আপনার যোগ স্থাপন করল, বাঙালীর দৃষ্টি প্রাদেশিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেল। এ ব্যাপারে চৈতন্যদেবের জীবনই হল তাদের প্রথম যোগসূত্র, আর তাঁর পরে সে সূত্র অবিচ্ছিন্ন রাখলেন বৃন্দাবনের গোস্বামীরা। তাঁরাই হয়ে ওঠেন গৌড়ীয় ভক্তিধর্মের প্রধান প্রণেতা ও পরিচালক।

কিন্তু শ্রীচৈতন্যের তীর্থ-পর্যটনের পর্ব শেষ হয়ে এসেছিল। এর পরে জীবনের শেষ আঠার বছর শ্রীচৈতন্য আর পুরী ছেড়ে কোথাও যান নি। রথযাত্রার সময় তাঁর বাঙালী ভক্ত ও অনুচরবৃন্দ অনেকে পুরীতেই আসতেন।সমস্ত সময়টা অতিবাহিত হত শ্রীকৃষ্ণলীলার কীর্তনে, গানে, প্রবল প্রেম-উচ্ছ্বাসে। দিনের পর দিন তাঁর জীবন কৃষ্ণ-প্রীতিতে উদ্বেল হয়ে উঠত। শেষের কয়েক বৎসর তাঁর প্রায়ই বাহজ্ঞানও থাকত না, ক্ষণে ক্ষণে তিনি শ্রীকৃষ্ণের মিলনবিরহ কল্পনায় বিহ্বল বিবশ হয়ে পড়তেন। এই দিব্যোন্মাদ অবস্থাই তাঁর অন্ত্যলীলা, এ সময়ে 'গম্ভীরা'য় সময় কাটত তাঁর। স্বাভাবিক মনুষ্য-দেহ ও মনুষ্য-প্রাণ এই প্রবল স্নায়বিক উত্তেজনায় ক্ষয় হয়ে যাবার কথা, সম্ভবত তা যাচ্ছিলও। কিন্তু একথা বললে ভুল হবে না যে, সত্যই প্রেম সেদিন রূপ গ্রহণ করেছিল, আর তা এই বাঙালী সন্ন্যাসীরই মধ্যে।

৪৮ বৎসর বয়সে পুরীতে শ্রীচৈতন্যের তিরোভাব ঘটে। কিন্তু কোথায় এবং কি ভাবে এই মহাপ্রেমিকের দেহাবসান হল, তার সঠিক উল্লেখ পাওয়া যায় না। পুরীতে কৃষ্ণভ্রমে সমুদ্রের নীলজলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন, এই হল সুপ্রচলিত কাহিনী। রথযাত্রার সময় নৃত্যকালে পায়ে তিনি আঘাত পান, আর তাতেই তাঁর দেহাবসান হয়, এ হল আরেকটি ক্ষুদ্র বিবৃতি।আসল কথা, বহু পূর্বেই 'মহাপ্রভু' অবতার বলে ভক্ত-সমাজে গৃহীত হয়েছেন।সেকালে কেন, এখনও যে এদেশ অবতারের দেশ। কাজেই তাঁর মৃত্যুর কথা আর ভক্ত-সমাজ আলোচনাই করেন না, তা তার দেবলীলার চূড়ান্ত রহস্য।

সামাজিক পরিবেশ: এই হল চৈতন্যদেবের জীবনীর রূপ-রেখা; আর খ্রীস্টীয় ১৪৮৬ থেকে খ্রীস্টীয় ১৫৩৩ এই হল চৈতন্যদেবের জীবন-কাল। চৈতন্যের বাল্যকালেই খ্রীঃ ১৪৯৩-এ হুসেন শাহ, গৌড়ের সুলতান হন, তাঁর পুত্র নুসরৎ শাহ রাজত্ব করেন খ্রীঃ ১৫১৯ থেকে ১৫৩২ অব্দ পর্যন্ত। মধ্যযুগের বাঙলার ইতিহাসে এটি সর্বাপেক্ষা গৌরবের কাল। বাঙলা সাহিত্যের ভাগ্যাকাশে হুসেন শাহ, ও নুসরৎ শাহ, দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র। রাজনৈতিক ও সমাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার পূর্বেই নৈশান্ধকার লঘু হয়ে আসছিল। অর্থাৎ এখানে সেখানে মুসলমান শাসকগণ হিন্দুর উপরে অত্যাচার করলেও বিজেতার সেই ধর্মগত উগ্রতা তখন আর নেই। অন্তত সুলতান ও শাসকবর্গ পুরাতন হিন্দু শাসকবর্গকে সমাদর করতে প্রস্তুত। হিন্দু কারিগর, কর্মচারী প্রভৃতি সাধারণ লোকদেরও তাঁরা উৎপীড়ন করতে ব্যস্ত নন। মালাধর বসুর মতো সনাতন রূপ প্রভৃতি অভিজাতেরা স্বচ্ছন্দেই রাজদরবারে উচ্চপদে আরূঢ়। এক কথায়, উপরতলার হিন্দু সমাজ ও উপরতলার মুসলিম সমাজও অনেকটা পরস্পরের সন্নিকট হতে চলেছে। তার ফলে, পরাগল খাঁর মতো উচ্চবর্গের মুসলমানরাও যেমন রামায়ণ মহাভারত প্রভৃতির পাঁচালী গান শুনছিলেন, উচ্চবর্গের হিন্দুরাও তার চেয়ে বেশি ফারসী, আরবী প্রভৃতি পড়ে রাজদরবারের ম্লেচ্ছ-আচার কিছু-না-কিছু গ্রহণ করছিলেন। অথচ হিন্দুর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ তখনই আবার শাস্ত্রচর্চা করে, নূতন দর্শন, স্মৃতি প্রভৃতি প্রণয়ন করে হিন্দু উচ্চবর্ণকে আত্ম-মর্যাদায় আস্থাশীল করে তুলছে।মালাধর বসু-ও রাজ-প্রসাদে অস্বস্তি বোধ করেন; সনাতন ও রূপের ত কথাই নেই। মনে হয়, হিন্দুর সাংস্কৃতিক জাগরণ চৈতন্যদেবের পূর্বেই সেই শাসকবর্গের সন্নিকটস্থ হিন্দু অভিজাতবর্গকে পর্যন্ত আপনার স্বপক্ষে লাভ করেছিল। অবশ্য এ জাগরণ নিতান্তই সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক নয়; তাই সুলতানদেরও আপত্তি হয় নি। এই ছিল শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব-কালে বাঙালী সমাজের অবস্থা।মিলিত বাঙালী হিন্দু-মুসলমান স্তরের নয়, বরং সেই নব-জাগ্রত আত্মরক্ষাকামী সংস্কৃতির প্রাণ-পুরুষ হয়ে উঠলেন শ্রীচৈতন্যদেব আর তাঁর বৈষ্ণব-মণ্ডলী।

অন্যদিকে একটা কথা স্মরণীয়--চৈতন্যদেবের তিরোধানের (১৫৩৩ খ্রীঃ) সময়ে পাঠান রাজত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পূর্বের তুর্কী ঔদ্ধত্য আর ছিল না,কিন্তু ছিল দুর্বল রাজত্বে ডিহিদার, ইজারাদার প্রভৃতি সামন্ত প্রভুদের অত্যাচার--খাজনা আদায়ের পীড়াপীড়ি, দুর্বলের প্রতি প্রবলের পীড়ন। মুসলমান সামন্তরা স্বভাবতই সে উৎপীড়ন চালাত ধর্মের নামে; বিজয়ী বলে আর নয়, সামন্ত-প্রভু বলেই। কিন্তু ১৫৭৫-৭৬ খ্রীস্টাব্দে মোগলেরা বাঙলা দেশ অধিকার করে;-অবশ্য বাঙ্গলা দেশকে সম্পূর্ণ সেই কেন্দ্রীয় শাসনের তলায় আনতে আনতে আকবরের রাজত্ব প্রায় শেষ হয়-অর্থাৎ সপ্তদশ শতকের প্রারম্ভ থেকে মোটের উপর বাঙ্গলা দেশে সামন্ত শক্তির উপদ্রব হ্রাস পায়। ততদিনে, একেবারে উত্তরাপথ থেকে শাসকবর্গের যে-সমস্ত মুসলমান কর্মচারী আসতেন তাঁরা ছাড়া অন্যান্য মুসলমান ছোট বড় সকলেই বাঙলা-ভাষী বাঙালীই হয়ে গিয়েছেন। বিজিত-বিজয়ীর যে বিরোধকে আশ্রয় করে শাসিত হিন্দুর প্রতিরোধ (১৩শ-১৫শ শতকে) সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ রূপে মূর্ত হয়েছিল, তা যখন সার্থক হল (১৬শ ও১৭শ শতকে), তার পূর্বেই সেই বিজেতা-বিজিত বিরোধ হ্রাস পাচ্ছিল, এখন (১৭শ শতকে) তা বিলুপ্ত হল। সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সার্থক হতেই এসময়ে এখন বিরোধ মন্দীভূত, অনেকটা নিরর্থক হয়ে উঠল। কারণ শাসকশক্তি তখন শাসিতের সাংস্কৃতিক পথ মুক্ত করে দিয়েছে। অষ্টাদশ শতকে এসে তাই মোগল শাসনও তার দরবারী কায়দা-কানুন বিস্তারের প্রশস্ততর পথ পেল।

বাঙলা সাহিত্যের চৈতন্য যুগ (খ্রীঃ ১৫০০-খ্রীঃ ১৭০০) অপেক্ষাকৃত নিরুপদ্রব সাংস্কৃতিক বিকাশের যুগ--যদিও বৈষ্ণব প্রেরণা ছিল প্রতিরোধের প্রেরণা, সে প্রতিরোধ রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক।

মধ্যযুগে উত্তর ভারতে, পারস্যে, ইউরোপে ও অনেক দেশে এরূপ আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন সাধক সম্প্রদায় ও তাঁদের ধর্মগুরুদের আবির্ভাব দেখা যায়, এটা আকস্মিক নয়। কারণ, তখন সমাজ সামন্ত যুগের কঠিন নিগড়ে বাঁধা ছিল। সেই বন্ধনের জ্বালা তারই মধ্যে কখন কখন অতি-সংবেদনশীল চিত্তে অসহ্য হয়ে উঠত। তাঁরা সেদিনের শ্রেষ্ঠ মানুষ, অচেতন বিদ্রোহী। তাঁদের সেই বিদ্রোহ তখনকার দিনে স্বাভাবিক ভাবেই রূপ গ্রহণ করত ধর্মগত কোন আবরণের আড়ালে তাতে অনেক সময়ে বাস্তব রাজশক্তি ও সমাজশক্তির কঠোর শাসন এড়িয়ে যাওয়া যেত, এবং অনেক সময়ে শাসকশক্তির অত্যাচার সইতেও হত না। অবশ্য বিদ্রোহটা বাস্তব ক্ষেত্রেও যে একেবারে প্রভাব বিস্তার করত না তা নয়। যখন সামন্ত যুগে সমস্ত সমাজই ছিল থাক-থাক করে ভেদের নীতিতে সংগঠিত; তখন এই আধ্যাত্মিক সাম্য ও মরমিয়া প্রেমভক্তিবাদ মানুষে মানুষে ভেদ-রেখা টানত না। এই আধ্যাত্মিক অভেদবাদ বাস্তব জীবনেও মানুষে মানুষে ভেদের রেখাটাকে মুছে ফেলতে চাইত। তাদের ভক্ত অনুচররা প্রায়ই আসত জনসাধারণ থেকে। আর তার জন্যই প্রায় দেশেই এই ধর্মগুরু ও তাঁদের মণ্ডলী রাজশক্তির হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। একথা বিশেষ করে সত্য পারস্যের সুফী সাধকদের সম্বন্ধে ও ভারতের নানক-শিষ্য শিখদের সম্বন্ধে।

চৈতন্যদেবের দানঃ মধ্যযুগের সাধকদের সম্বন্ধে যে কথা সত্য, তা শ্রীচৈতন্যদেবের সম্বন্ধেও সত্য। প্রেমধর্ম সম্বন্ধে তাঁর যে মতবাদ তা হল সামন্ত যুগের মতাদর্শের বিকদ্ধে একটা প্রতিবাদ, কিন্তু সে প্রতিবাদ সামন্তযুগের মতাদর্শ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তও নয়। তা সামন্ত সমাজ-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বীকার করে না, অথচ সে ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিতেও প্রস্তুত নয়। চৈতন্যদেব মুসলমান-শাসিত হিন্দু সমাজের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রবক্তা হিসাবে সদাচারী, হিন্দু সমাজধর্মের পক্ষপাতী;হলেও জাতিভেদের বিরুদ্ধেও তিনি প্রত্যক্ষত দণ্ডায়মান হন নি। কিন্তু সামন্ত যুগের অনুদার মতাদর্শকে অস্বীকার করেই তিনি প্রচার করলেন-জীবে দয়া, ঈশ্বরে ভক্তি, বিশেষ করে নাম-ধর্ম, নাম-সংকীর্তন। এই অধিকারভেদের দেশে কৃষ্ণ নামে আব্রাহ্মণ-চণ্ডাল সকলেরই অধিকার, এই একক সাধনার দেশে সকলের সমবেত সংকীর্তন নবদ্বীপের পথে পথে, পুরীর রথাগ্রেও সকল জাতের মানুষ নিয়ে প্রেমের পরমোৎসব। সেখানে যবন হরিদাস পর্যন্ত তার পরম অনুগ্রহভাজন সহচর, এসব আসলে চৈতন্যদেবের মহং সংস্কার-প্রয়াসেরই প্রমাণ। এদেশে, এ সমাজে-সে যুগের তুলনায়,-নিশ্চয়ই এই সাধনাদর্শ ও সাধন-প্রয়াসকে আমরা আজকের প্রচলিত ভাষায় 'গণতান্ত্রিক' বলতে পারি যদিও তা রাষ্ট্রশক্তির সম্বন্ধে নিরপেক্ষ। নবদ্বীপের কাজীর মত অত্যাচারী রাজপুরুষকে প্রতিরোধ করা তাঁর প্রয়োজন, কিন্তু সাধারণ ভাবে রাজা ও

রাজশক্তিকে তা আবার মেনে নেয়। সমাজশক্তিকেও তা অস্বীকার করতে ব্যস্ত নয়।কৃষ্ণনামে সকলের অধিকার স্থাপনেই তা সন্তুষ্ট, বর্ণভেদ, উচ্চনীচ ভেদ তুলে দিয়ে সামাজিক সংহতি স্থাপনের কথা মুসলমান সমাজকে দেখেও সেটা প্রয়োজনীয় মনে করে নি। এ হিসাবে বুদ্ধদেবের সঙ্গেই চৈতন্যদেব তুলনীয়, দু'জনেই সমাজের মহৎ সংস্কারক, তবে বিপ্লবী নন, বিদ্রোহীও পুরোপুরি নন। সে ভাবে তাঁদের চিত্রিত করলে বা পরিমাপ করতে গেলে সেকালের উপর আমরা একালের আদর্শ চাপাবো।

মধ্যযুগের সাধারণ অন্যান্য সাধকগুরুর মতো শ্রীচৈতন্যদেবেরও ভূমিক। ছিল প্রধানত সংস্কারকের, ভাববাদী বিদ্রোহীর। কিন্তু বাঙালী সমাজে তাঁর নিজস্ব একটি ভূমিকা ছিল, তাও আমরা এখানে দেখতে পাই। বাঙালী শাসিত শ্রেণীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধকে তিনি সার্থক রূপ দান করেন। একদিকে অভিজাতদের মধ্যে মেচ্ছাচার রোধ করে, অন্যদিকে জনসাধারণকে সংকীর্তন ও নামধর্মের সাহায্যে প্রেমধর্মে সমান অধিকার দান করে। আর তৃতীয়ত এইভাবে হিন্দু সমাজের উচ্চ ও নিম্ন বর্গকে এক-ধর্মাচরণে ও ভাবাদর্শে পরস্পরের সন্নিকট করে শ্রীচৈতন্যদেব এক আত্মীয়-ভাবাপন্ন হিন্দু সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করেন;-এবং সেই সমাজের মন থেকে আগেকার অনুষ্ঠান-বাহুল্য কতকটা বিদূরিত করেন, সাধারণ ভাবে সেই মনে জাগিয়ে তোলেন সমকালের প্রতি একটা মমতা (তাই চৈতন্য-ভক্তের কথা হল, 'প্রণমহ কলিযুগ সর্বযুগ সার'),মানুষের একটা মূল্যবোধ (তুচ্ছতম মানুষও 'মুচি হয়ে শুচি হয় যদি কৃষ্ণ ভজে')।মরা মানুষেরও একটা ঐশী মহিমা ('কৃষ্ণের যতেক খেলা সর্বোত্তম নরলীলা,নরবপু তাহার স্বরূপ')। এই সাংস্কৃতিক-সামাজিক জাগরণে বাঙালীর চেতনা সাহিত্যে, সঙ্গীতে, দর্শনে নানাদিকে অপূর্ব ভাবৈশ্বর্যে মূর্ত হয়ে উঠল। কিন্তু বাঙালীর এই জাগরণ সম্পূর্ণ জাগরণ নয়, কারণ বাস্তব জীবন ও বৈষয়িক উদ্যোগ-প্রয়াস এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে দূরে সীমাবদ্ধ কয়েকটি ক্ষেত্রেই এই জাগরণ আবদ্ধ ছিল। তবু এই জাগরণ এক পরম মহোৎসব, আর সাহিত্যে মুখ্যত তা শ্রীচৈতন্যদেব ও তাঁর ভক্ত বৈষ্ণবমণ্ডলীর দান।

Disclaimer:- Collected and rewritten by Md. Mohsin Islam.


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিকথা (খ্রিস্টীয় ১৪-১৭ শতক)