বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিকথা (খ্রিস্টীয় ১৪-১৭ শতক)
বাংলা মঙ্গলকাব্য (খ্রিস্টীয় ১৪-১৭ শতক)
(....একসময় ভারতের সর্বত্র বৌদ্ধধর্মের অধিকার প্রসার লাভ করে। বৌদ্ধধর্মের এই ব্যাপক প্রভাব থেকে বৈদিক হিন্দুধর্মকে রক্ষা করাব জন্য যখন সংস্কারের আবশ্যক হয়, তখন স্বর্গের দেবদেবীদের লৌকিক রূপ দিয়ে মর্ত্যভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা কবিদের মধ্যে দানা বাঁধে।...এই পুরাণের প্রেরণা থেকেই বাংলায় বিভিন্ন ধারার মঙ্গলকাব্যের রচনা শুরু হয়।...)
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে বাংলা সাহিত্যে কিছু ধর্মমূলক আখ্যানকাব্যের সন্ধান মেলে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই সব ধর্মমূলক আখ্যানকাব্যকে 'মঙ্গলকাব্য' অভিধায় চিহ্নিত করা হয়। 'মঙ্গল' অর্থাৎ কল্যাণ, এবং কল্যাণের সঙ্গে মাহাত্ম্যসূচক একটা সম্পর্ক যোজনা করে দেবদেবীদের মহিমা-কীর্তনের অভিপ্রায়ে রচিত হয়েছে বাংলা মঙ্গলকাব্য। আসলে দেবদেবীদের মহিমার প্রকাশ করা হয়েছে প্রধানত তাঁদের স্বেচ্ছাচারজনিত ভয়-ভীতির কারণে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের কাছে কিছু পাওয়ার অভিলাষে। এসব অভিপ্রায়ে মঙ্গলকাব্যের কবিগণ বিশেষ কোনো শক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী কিংবা দেবতার গুণকীর্তন করে এই ধারার কাব্যের সূচনা করেন।
তবে মঙ্গলকাব্যে সাধারণত হিন্দুপুরাণনির্ভর কোনো কাহিনীর আশ্রয়ে বিশেষত মানবভাগ্যের কথাই ব্যাক্ত করা হয়েছে। এই কাহিনীর নায়ক একজন স্বর্গচ্যুত ব্যক্তি। তিনি অশেষ মানবিক গুণের অধিকারী। এই দিক থেকে একথা মনে করার কারণ আছে যে মঙ্গলকাব্যে দেবতাদের যে আধিপত্য তাতে পরোক্ষত স্বৈরতন্ত্রের প্রভাব সঞ্চার করে, কিন্তু এই হীন কূটকৌশলগত দৈবপ্রয়োগ দেবতার অধিকার বাড়ায় না, বরং মানুষের অনিচ্ছাকৃত স্বীকৃতির মধ্যেই দেবসমাজের প্রতিষ্ঠা হয়। সুতরাং মঙ্গলকাব্য প্রকৃতপক্ষে মানুষেরই জয়গান। সার্বজনীন মানবতার বিকাশ সাধনের জন্যই, একথা বলা যায়, মঙ্গলকাব্যের কাব্যমূল্যও অটুট। বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সঙ্কট সমস্যাজনিত পর্যায়ের মুখোমুখি হয়। এরূপ অবস্থায় বাংলার সামাজিক জীবনে লৌকিক ও বহিরাগত বিভিন্ন ধর্মের যে সমন্বয় ঘটেছে, তার ইতিহাস লক্ষ্য করি বাংলা মঙ্গলকাবের মধ্যে। তবে মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব, বিকাশ ও পরিণতির স্তবগুলো প্রধানত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বাংলা মঙ্গলকাব্যের উদ্ভবের পরিপ্রেক্ষিত! বাংলাদেশের যুগসঙ্কট মোচনের অভিপ্রায়ে মঙ্গলকাব্যের কবিরা স্বর্গের দেবদেবীদের লৌকিকরূপে মর্ত্যভূমে আনয়ন ও প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান। মঙ্গলকাব্যে স্ত্রীদেবতার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সমস্যার নির্মাতা ও সমাধানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে মনসামঙ্গলের মনসা ও চণ্ডীমঙ্গলের চণ্ডীকে কল্পনা করা হয়েছে। পুরুষ দেবতা হিসেবে ধর্মমঙ্গলের ধর্ম ও শিবমঙ্গলের শিবের নাম উল্লেখ করা যায়। যেহেতু এইসব দেবদেবীকে কল্পনা করা হয়েছে প্রধানত দেশের জনসাধারণের বিভিন্ন সমস্যার ত্রাণকারী হিসেবে, সেজন্য তাঁরা সাধারণের কাছ থেকে একচেটিয়া ভক্তিশ্রদ্ধা অর্জন করতে সমর্থ হন। কবিদের কল্পনায় লালিত এঁরাই তখন সমস্যাপীড়িত জনসাধারণের একমাত্র সান্ত্বনা; এঁদের আশ্রয়ে জনগণ অনেক দুঃখ-বেদনার সমাধান সন্ধান করে। বিনিময়ে তাঁরা ভক্তের কাছ থেকে অক্লেশে পূজাস্বরূপ উৎকোচ গ্রহণ করেন।
এসব দেবদেবীকে মর্ত্যভূমে প্রতিষ্ঠিত করার আরো কিছু কারণ আছে। একসময় ভারতের সর্বত্র বৌদ্ধধর্মের অধিকার প্রসার লাভ করে। বৌদ্ধধর্মের এই ব্যাপক প্রভাব থেকে বৈদিক হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার জন্য যখন সংস্কারের আবশ্যক হয়, তখন স্বর্গের দেবদেবীদের লৌকিক রূপ দিয়ে মর্ত্যভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা কবিদের মধ্যে দানা বাঁধে। সংস্কৃত পুরাণগুলো রচিত হয়েছিলো এঁদের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে। এক একটি পুরাণ এক একটি দেবতার মাহাত্ম্যকীর্তন করে প্রণীত হয়। এবং এই পুরাণের প্রেরণা থেকেই বাংলায় বিভিন্ন ধারার মঙ্গলকাব্যের রচনা শুরু হয়।
কিন্তু স্বভাব ও পরিবেশের তাড়নায়েই হয়তো পৌরাণিক আদর্শ রক্ষার চেয়ে লৌকিক আদর্শ রক্ষার প্রতি বাংলা মঙ্গলকাব্যের কবিগণের প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।
সেন রাজগণের পতনের পর এদেশে মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা হয়। তার ফলে শুরুতে মুসলিম ধর্মের সঙ্গে হিন্দুধর্মের বিরোধ বাধে। মুসলিম রাজত্বের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম ধর্মমতের সঙ্গে স্থানীয় লৌকিক ধর্মমতগুলোর বিরোধ প্রবল আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে বহিরাগত একটি নতুন ধর্মের সঙ্গে আপোস করতে না পেরে দেশের জনগণ অত্যন্ত বিপন্ন বোধ করতে থাকে। তখন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য বাঙালি কবিরা স্বর্গের দেবদেবীগণকে মর্ত্যভূমে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। ঐহিক জগতের যাবতীয় সুখ সুবিধা ও দুঃখ দুর্দশা স্বর্গের দেবদেবীগণের ইচ্ছাধীন মনে করে কবিগণ ধর্ম ও সমাজের সঙ্কটময় মুহূর্তে এদেশের বিপন্ন জনগণকে দেবদেবীদের পরাক্রমের কাছে আশ্রয়লাভের উপদেশ দেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই যে এত সব মানসিক আয়োজন তার আসল কথা হলো প্রবল মুসলিম রাজশক্তির দ্বারা শাসিত দুর্বল হিন্দুসমাজ আত্মশক্তিতে আস্থা হারিয়ে অবশেষে নিঃসহায়ভাবে তখন দৈবনির্ভর হয়ে পড়ে।
তবে মুসলিম রাজশক্তি সম্পর্কে স্থানীয় জনমনে যে ভীতি ও আতঙ্ক, তার সম্বন্ধ যোজনা হয় বাইরের দিক থেকে; কিন্তু ভেতবরর দিক থেকে যে অভিঘাত, তার প্রকাশ ঘটে ব্যাধি ও মহামারী সম্পর্কে জনসাধারণের ভয় ভাবনা এবং হিংস্র জীবজন্তুর কবল থেকে উদ্ধারলাভের প্রার্থনার মাধ্যমে। এক সময় কলেরা ও বসন্তের নির্মম ছোবলে পল্লীবাংলার আক্রান্ত অঞ্চলগুলো মৃত্যুজনিত কারণে প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়তো। এই দুই নারীশক্তিকে যথাক্রমে ওলাবিবি ও শীতলাদেবী কল্পনা করে তাদের দুষ্ট আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভীতকম্পিত জনসাধারণ পূজাপ্রথার মাধ্যমে তাঁদেরকে জনসমাজে প্রতিষ্ঠিত করে। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে এঁদের গাথা রচনার প্রয়াসও একই কারণে হয়।
এই পরিস্থিতিতে এক একটি ধর্মসম্প্রদায়ও গড়ে ওঠে। এসব ধর্মসম্প্রদায়ের বিভিন্ন কবি বিভিন্ন দেবদেবীর মাহাত্ম্যকীর্তনের স্বপ্নাদেশ পেয়ে কাব্যরচনায় মনোনিবেশ করেছেন বলে জনসাধারণের কাছে দাবি করতেন। তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় সংঘাতের বাইরে জনগণের এই দৈবনির্ভরতা থেকে এরূপ মনে করা যায় যে বাংলা সাহিত্যের এই পর্বে যে দেববন্দনা, তার মূলে কাজ করেছে বাঙালির মনোজগতে আন্দোলিত প্রেম আর ভক্তি নয়, বরং তার বিপরীত ভয় আর ভীতি। এবং এই ভয় আর ভীতির দেবতা ওলা, শীতলা, মনসা প্রমুখের কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করার কারণও আসলে তাঁদের সহচর ঐসব রোগবালাই ও সর্পদংশন রূপ বিপদ আপদ থেকে সাধারণের পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় সন্ধান।
মন্তব্যসমূহ